আমরা মুসলমানদেরকে আবারও কি ফিরে যেতে হবে বিজ্ঞানে? (প্রথম খন্ড)

بِسۡمِ ٱللهِ ٱلرَّحۡمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِِ

 In the name of Allah, Most Gracious, Most Merciful.

 ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَِ

 


Praise be to Allah,

The Cherisher and Sustainer of the Worlds;

(Source:  Sūra 1: Fātiha, Ayat: 1, https://quranyusufali.com/1).

আমরা মুসলমানদেরকে আবারও কি ফিরে যেতে হবে বিজ্ঞানে? (প্রথম খন্ড)                                        

 -মুহাম্মাদ  শেখ রমজান  হোসেন     

গবেষণা এবং আল কুরআন

 চিন্তা-ভাবনা-গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করে মহান আল্লাহ তায়া'লা পবিত্র কুরআনে ফরমান:

٢٩- كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ

 “আমি আপনার নিকট বরকতময় কিতাব (আল কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে করে তার আয়াতসমূহ নিয়ে তারা গবেষণা করে।” (সূরাহ ছা-দ: ২৯)

٨٢- أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّـهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَلَا

 “তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? উহা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত তবে তারা তাতে অনেক মতপার্থক্য পেত।” (নিসা- ৮২)

 আল কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব

٢٤- أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا أَفَلَ

তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা মেরে দেয়া হয়েছে?” (সূরা মুহাম্মাদ- ২৪)

0-   أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَـٰكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ


‘তারা কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না, যাতে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারে! বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের হৃদয়।’ (সূরা হজ : ৪৬)

.
١٧- أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ

١٨- وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ

١٩- وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ

٢٠- وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ 

‘তবে কি তারা লক্ষ্য করে না উটের প্রতি, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে এবং পাহাড়সমূহের প্রতি, কীভাবে তাকে প্রথিত করা হয়েছে এবং ভূমির প্রতি, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে’। (সূরা গাশিয়া ১৭-২০)

১১৪ সূরাহ বিশিষ্ট ৩০ পারা পবিত্র কুরআনের পরতে পরতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির অপূর্ব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন উদ্দেশ্যঃযাতে মানুষ চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা করে মহান আল্লাহর খ্বলক্বিয়াত সম্পর্কে সম্যক অবহিত হয়ে একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত-বন্দেগী করে আদি আবাসস্থল জান্নাতে ফিরে যেতে পারি। ওলামায়ে কেরামদের মতে পবিত্র কুরআনের শত শত আয়াতে চিন্তা-গবেষণামূলক আয়াতের উদ্বৃতি করা হয়েছে।

সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনাকে জিকরুল্লাহর শামিল গণ্য করে এর ব্যাপক ফজিলত বর্ণনা করে ইজতিহাদে উৎসাহিত করা হয়েছে পবিত্র ইসলামে। ইজতিহাদে কামিয়াবীতে ২ নেকী, নাকামিয়াবীতে ১ নেকী। ইজতিহাদ বা গবেষণা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির রূহ, আত্মা বা প্রাণ। এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মানঃ বিজ্ঞান দ্বীন ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

প্রথমতঃ পবিত্র ইসলাম মধ্যপন্থার নীতি আদর্শে প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম তাই একাধারে পারলৌকিক ও ইহলৌকিক উভয় বিষয়ের দিক নির্দেশক। ইহলোকিক-পারলৌকিক উভয় বিষয়াবলীর মধ্যে বিজ্ঞান অন্যতম। বিজ্ঞানের প্রযুক্তি ইহলৌকিক কল্যাণ বয়ে আনে অন্যদিকে বিজ্ঞানের সত্য নীতি-আদর্শ পারলৌকিক মুক্তির পথ এবং পাথেয়।

দ্বীন আল ইসলামকে বলা হয় মানব ফিতরাতের ধর্ম। মানব ফিতরাত বা স্বভাব সত্য প্রবণ। আর সত্য হচ্ছে ইসলামের মৌলিক ভিত্তি। যুগে যুগে নবিয়্যিন-সিদ্দিকীনরা সত্য প্রচার করেছেন এই বলেঃ ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবিন-সত্য প্রচারই আমাদের (নবী-রসূলদের) কাজ (সূরাহ ইয়া-সীন)।

বলা হয়ে থাকে, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সেদিন থেকে শুরু যেদিন মানব মনে সত্যকে জানার আগ্রহ জাগে। সুতরাং, বিজ্ঞান মনস্কতা সত্য মনস্কতার নামান্তর-যা মানব ফিতরাতেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

উল্লেখ্য, মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আ'লাইহিমুস সালামের মাধ্যমে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম বস্ত্র ও কৃষি প্রযুক্তি, লুকমান আলাইহিমুস সালামের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রযুক্তি, হযরত মূসা আলাইহিমুস সালামের হাতের লাঠি সাপে পরিণত হওয়ার ঘটনার সাথে আধুনিক বিজ্ঞানে বস্ত্তকণার তরঙ্গমালায় পরিণত হওয়ার বৈজ্ঞানিক যোগসূত্রতা, ঈসা আলাইহিমুস সালামের মাধ্যমে অন্ধত্ব চিকিৎসা প্রযুক্তি, চোখের পলকে সোলায়মান আলাইহিমুস সালামের রাজ দরবারে আনীত সাবার রাণী বিলকিসের সিংহাসন আনায়ন,  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক কুদরতি যানবাহন বুরাকযোগে ত্বরিৎগতিতে ইসরা (নৈশ ভ্রমণ) গমনে যে দ্রুতযানের ব্যবহার তাতে খুলে যায় আধুনিক বিজ্ঞানের রকেট প্রযুক্তির সম্ভাবনার দ্বার় খুলে যায়।

এ জাতির (মুসলমান) জিল্লতির কারণ দ্বীন-ধর্মের প্রতি উদাসীনতা

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উসমান ইবনে আফফান জিন্নুরাইন রদ্বিয়াল্লাহু আনহু যথার্থই বলেছিলেনঃ " এ জাতির (মুসলমান) জিল্লতির কারণ দ্বীন-ধর্মের প্রতি উদাসীনতা। অভাব-অনটন এ জাতিকে কাবু করতে পারে না"।

হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী দুনিয়ার প্রথম বৈজ্ঞানিক

"হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু মদীনাতে অবস্থান করিয়া সাহাবাদিগকে সুশিক্ষিত করিবার উদ্দেশ্যে প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছিলেন। তিনি ও তাঁহার পিতৃব্য আব্বাসের পুত্র আবদুল্লাহ্ (ইবনে আব্বাস) মদীনার মসজিদে বিজ্ঞান, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, হাদীস, অলংকারশাস্ত্র ও মুসলমানদিগের সাধারণ বিধি সম্বন্ধে বক্তৃতা প্রদান করিতে এবং অপরাপর বক্তা অন্যান্য বিষয়ে উপদেশ দান করিতেন। যে শিক্ষা ও সভ্যতার জন্যে বাগদাদের খলীফাগণ এককালে জগতে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন, সেই শিক্ষা ও সভ্যতার বীজ এই প্রকারে মদীনার মসজিদে প্রথম রোপিত হইয়া ছিল।“

হযরত আলী (রাঃ)-এর কাব্য বাণী

"যুজ আল ফারার ওয়তি তালাক

ওয়াশ্ শায়য়ান আশবাহুল বারাক

এজাসাম জালাত ওয়া আস কাহাৎ

মালাক তাল গারার ওয়াশ্ শারার"।

অর্থ : “পারদ ও অভ্র একত্র করে যদি বিদ্যুৎ ও বজ্র সদৃশ কোন বস্তুর সঙ্গে সংমিশ্রণ করতে পার, তাহলে প্রাচ্য ও পাশ্চত্যের কর্তৃত্বের অধকিারী হতে পারবে।“

উল্লখ্যে, (১) ইলেকট্রন, (২) প্লোটন ও (৩) নিউট্রন- -এই ৩ প্রকার পরমাণুর মধ্যে ‘প্রোটন’ পরমাণুকে সংশ্লেষণ করলে নাকি তা স্বর্ণে পরিণত করা যায়। (সূত্রঃ ১. স্পিরিট অব ইসলামঃ সৈয়দ আমীর আলী। ২. বিজ্ঞানে মুসলমানের দান: এম. আকবর আলী।

“পরশ পাথর”

পরশ পাথর-যার সংস্পর্শে লোহা স্বর্ণে পরিণত হতে পারে। পারদ ও অভ্রকে বিদ্যুৎ বা বজ্রের মত ভীষণ তেজস্কর অগ্নি-সংশ্লেষাত্মক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার আভাষ দিচ্ছেন। আবু আলী সীনাও স্বর্ণ প্রস্তুতে হযরত আলী (রাঃ)-র মত পারদকে অপরিহার্য ধরে নিয়ে অতিশয় বিশুদ্ধ গন্ধক ও পারদ জমিয়ে কঠিন করে স্বর্ণ প্রস্তুতের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলন।

উল্লেখ্য, অষ্টম শতাব্দীর আরব রসায়ন বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানের মূলনীতি অনুসারে ঠান্ডা+ভেজা (cool-moist গুণ বিশিষ্ট এবং  ‘গরম’ +‘শুকনো’ (hot-dry)। (hot-dry)গুণ বিশিষ্ট সালফার-এই চারটা ধর্মই তৈরি করে মূল সাতটা ধাতু—স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা, টিন, লোহা, সিসা ও পারদ।এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের প্রাণ "প্রথম পর্যায় সারণি" (Primary Periodical Table) রচিত হয়। পরশ পাথর প্রযুক্তি আল কেমি নাম ধারণ করে পরবর্তীতে তা ইংরেজী পরিভাষায় কেমিস্ট রসায়ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।

রবার্ট বয়েল প্রথম আলকেমি আর রসায়নের মধ্যে একটা রেখা টেনে দেন। এমনকি বয়েলের ধারণাতেই তখন উঠে আসে পরমাণু-অণু-রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো কিছু ধারণার আভাস।

এক নজরে দুনিয়া কাঁপানো মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানীদের জীবনকাহিনী

ইউরোপীয় সভ্যতা বিকাশে মুসলমানদের অবদান 

“পরীক্ষা ও অনুদর্শন হচ্ছে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল ভিত্তি। মানুষ মনে করে এটা ফ্রান্সিস বেকনের অবদান। কিন্ত্ত এখন স্বীকার করতে হবে যে, এটা আসলে আরবদের দান” । (ফ্রান্সের ঐতিহাসিক গেটাব লিবন, Islam and the West by Abul Hasan Ali Nadvi প্রাগুক্তঃ পৃঃ ১৫)।

ইসলাম বিজ্ঞানের প্রতিবন্ধক নয়; সহায়ক

ইসলাম বিজ্ঞানের প্রতিবন্ধক নয়, বরং ইসলাম বিজ্ঞানকে ঢেলে সাজাতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে। তাই আমরা বলতে পারি, বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের অবদান সর্বাধিক। এ প্রসঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম রূপকার মিঃ ব্রিফল্ট-র মন্তব্যঃ Science is the most momentous contribution of Arab civilization to the modern world.আধুনিক বিশ্বের জন্য বিজ্ঞান হল আরব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ দান।তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন, European Science owes its existence to the Arabs. অর্থাৎ ইউরোপীয় বিজ্ঞান তার অস্তিত্বের জন্যই আরবদের তথা মুসলমানদের নিকট চিরঋণী।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের ভূমিকা

“রোম, গ্রীক, কার্তেজ, পারস্য জগতে যখন বিদ্যা শিক্ষার বালাই ছিলো না, তখন ইউরোপের উপকন্ঠে মুসলমানরা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপন করে যাচ্ছিল (মুসলিম কীর্তিঃ ডঃ আব্দুল কাদির, পৃঃ ৮৩, প্রাগুক্তঃ পৃঃ ১)।

স্বামী বিবেকানন্দ এ সত্যটি স্বীকার করে বলনে, মুর নামক মুসলমান জাতি স্পেন দেশে অতি সুসভ্য রাজ্য স্থাপন করতঃ নানান বিদ্যা র্চচার ফলে ইউরোপে প্রথম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।

ভ.ই. লেনিনের র্শীষ সহযোগী শ্রী মানবন্দ্রেনাথ রায় বলনে,Learning form the Muslim Europe became the leader of modern civilization. র্অথাৎ মুসলমি শিক্ষার প্রভাবেই ইউরোপ আধুনিক সভ্যতার নেতা হতে পেরেছে।

উল্লেখ্য, যখন ইউরোপে অন্ধযুগের অভিশাপে শিক্ষা শুধু গীর্জা ও মঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তখন মুসলিম শাসিত স্পেনের কর্ডোভা, গ্রানাডা, সেভিল, জ্যালেনসিয়া, টলেডো, জাতিভা ও আলমেরিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ গড়ে উঠেছিল। এসব মুসলিম সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। এগুলোকে ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্মদাতা বলা যায়। অবশ্য ইংরেজরা তাদের লেখায় পরিষ্কারভাবে তা স্বীকার করেছেন। যেমন মিঃ নিকোলসন বলেছেন, মুসলমানদের কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় স্পেন, ফ্রান্স, ইটালী এমনকি জার্মানীর জ্ঞান সাধকদের চুম্বকের মতো টেনে আনতো।একমাত্র কর্ডোভাতে বিনা বেতনে শিক্ষাদানের জন্য স্কুলের সংখ্যা ছিল ৮০০টি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই শিক্ষার্থীরা এখানে এসে ভিড় করত। দ্বিতীয় ‘পোপ সিলভারস্টার’ জারবার্তার ব্যক্তিগত শিক্ষালাভ ঘটেছিল কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পবিত্র কুরআন ও মুসলিম আইন ছাড়াও , ল্যাটিন, হিব্রু, প্রকৃতিবিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, কবিতা, শিল্প, রসায়ন শিল্প শিক্ষা দেয়া হ’ত। নবম শতাব্দীতে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার।

 “এখন পর্যন্ত ইউরোপ সর্বান্তঃকরণে ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার ব্যাপক ও স্হায়ী দান মনে প্রাণে স্বীকার করেনি। উদাসীনতা ও অনিচ্ছাভরে তারা শুধু এটুকু স্বীকার করেছে যে, অন্ধকার যুগে (মধ্যযুগে) ইউরোপীয়রা যখন সামন্ত প্রথার যাঁতা কলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন আরবদের নেতৃত্ব মুসলিম সভ্যতা সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে শীর্ষে আরোহন করেছিল। মুসলমানদের অবদান ছাড়া ইউরোপ এখনো অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হতো”। (মেজর আর্থার গ্লিন লিউনারঃIslam her Moral and Spiritual Value,, প্রাগুক্তঃ পৃঃ ১৫)

অন্যদিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন আওয়ার সস্ত্রিক ওয়াশিংটন ডিসির ইসলামিক সেন্টার নির্মিত মসজিদ উদ্বোধন করেছিলেন ১৯৫৭ সালের ২৮ শে জুন (সূত্রঃ https://statedept.brightcovegallery.com/detail/video/1790912746/islamic-center-dedication---president-eisenhower )।

উদ্বোধনকালে আবেগতাড়িত হয়ে আইজেন আওয়ার বলেছিলেনঃ  “And I should like to assure you, my Islamic friends, that under the American Constitution, under American tradition, and in American hearts, this center, this place of worship, is just as welcome as could be a similar edifice of any other religion,” President Dwight D. Eisenhower said.

The president noted that “civilization owes to the Islamic world some of its most important tools and achievements. From fundamental discoveries in medicine to the highest planes of astronomy, the Muslim genius has added much to the culture of all peoples. That genius has been a wellspring of science, commerce, and the arts and has provided for all of us many lessons in courage and in hospitality.”

Source: https://www.politico.com/story/2018/06/28/eisenhower-dedicates-dc-islamic-center-june-28-1957-667325).  

Noted that president George W. Bush visited the above Mosque on Sept. 17, 2001, and appearing on national television, Bush quoted from the Quran while striving to assure Americans that a clear majority of Muslims remain peaceful and reject terrorism. (Source:i) SOURCE: “THIS DAY IN PRESIDENTIAL HISTORY,” BY PAUL BRANDUS ii) https://www.politico.com/story/2018/06/28/eisenhower-dedicates-dc-islamic-center-june-28-1957-667325).

উল্লেখ্য, গত বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামে অবস্থিত Chittagong University-তে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনে আগত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা আরব বিজ্ঞানীদের স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেনঃ অতীতে তাঁদের পূর্বপুরুষরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য দলে দলে মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বাগদাদের বায়তুল হিকমা, মুসলিম শাসিত স্পেনের কর্ডোবার আল হেরায়) ভর্তি হতেন। (সূত্রঃ দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম)। 

"Very few of the Moslems of our time are aware of the great role played by Islam in the play house of history"

"মুসলমানদের মধ্যে অল্প সংখ্যাক ব্যক্তি অবহিত যে, ইতিহাসের রঙ্গমন্চে মুসলমানদের কি বিশাল অবদান রয়েছে"  [রুশ বিপ্লবের নেতা  ভ.ই. লেনিন, এর ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহচর মানবন্দ্রে নাথ রায় (এম.এন.রায় )].

চন্দ্রপৃষ্ঠের আগ্নেয়গিরির মুখে তিনজন বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানীর নামে নামকরণ 

চন্দ্রপৃষ্ঠের  তিনটি আগ্নেয়গিরি মুখে নামকরণ করা হয়েছে তিনজন বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানের নামে। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ৩ জন হচ্ছেনঃ ১. আলবরেুনি ২. ইবনে সিনা এবং ৩. ওমর খৈয়াম প্রমুখ। 

১৯৭১ সালে International Astronomersএ নামকরণ করা হয়ছেলি International Astronomical Union  র্কতৃক। (সূত্র ইতিহাসের পাতা থেকে, লেখকঃ সৈয়দ আশরাফ আলী, সাবেক মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ  

এর পূর্বে ১৯৩৫ সালে International Astronomical Union কর্তৃক চন্দ্রপৃষ্ঠের ১৩ টি Lurnar Farmers যা তখনকার সময়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্ররে সাহায্যে পরিমাপ করা হয়েছে তাতে স্থান পেয়েছেন ১৩ জন বিজ্ঞানীর নামে যাদের সবার নাম আরবীতে। তন্মধ্যে একজন আরব রয়েছেন- যিনি মুসলিম রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞান চর্চা করায় এবং আরবী নামের সুবাদে মুসলিমের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে । তিনি হচ্ছে মাশা আল্লাহ-যিনি ধর্মে ইহুদী  

উক্ত ১৩ জনের নাম অন্যতম হচ্ছেন    ১. আব্দুর রহমান আল সুফি ২. উলুগ বেগ ৩. মাশাল্লাহ ৪. আলফা রাগানি ৫. আল বাতানি ৬ সাবিত ইবনে কুররা ৭. আল হাসান আল হাইশাম. ৮. আল যারকালী ৯. যাবির ইবনে আফলাহা ১০. নাসিব আল দ্বীন প্রমুখ।

 ১. ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসারে আহলে বাইতে রসূলুল্লাহ ﷺ হযরত জাফর সাদিক রহিমাহুল্লাহ এর ভূমিকা

হযরত জাফর সাদিক রহিমাহুল্লাহ ছিলেন হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহ আনহু বংশোদ্ভূত আহলে বাইতে রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রাণ পুরুষ এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের জীবন্ত প্রতীক।

হযরত জাফার সাদিক রহিমাহুল্লাহ ৮৩ হিজরির ১৭ রবিউল আউয়াল মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন ও ৬৫ বছর বয়সে ১৪৮ হিজরিতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি জান্নাতুল বাকীতে প্রিয় পিতার পাশে সমাধিস্থ হন।পিতা ছিলেন হযরত বাকির রহিমাহুল্লাহ ও মাতা ছিলেন উম্মে ফারভাহ।

হযরত সাদিক রহিমাহুল্লাহ ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় অতিক্রম করছিলেন, যখন বিশৃঙ্খলা, বিরোধ ও রাজনৈতিক বিবাদ ইসলামি সমাজে এমন আকারে বিস্তৃতি লাভ করেছিল যে, তদানিন্তন সমাজ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ঠিক এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবাণীতে হযরত জাফর সাদিক রহিমাহুল্লাহ –এর  প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাপূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটাতে সহায়ক হয় এবং দিশেহারা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটিয়ে বিশ্বমানবতাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপত্যকার সন্ধান পেতে সহায়ক হয়।

হযরত সাদিক রহিমাহুল্লাহ এর লদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাফসীর, কোরআন তত্ত্ব, হাদীস, ফিকাহ, ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি অন্যান্য জ্ঞান, যেমন : গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও আরও শতাধিক বিদ্যার পাঠ দানের মাধ্যমে। যা ছিল আজকের এবং ভবিষ্যৎ মুসলিম উম্মাহসহ তাবৎ প্রজন্মের মানুষের জ্ঞানের উৎস।

১৩২ হিজরিতে উমাইয়্যা শাসনের অবসান ঘটে ও আবাসীরা ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করে। আব্বাসীয় খলিফারা ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে এক সোনালি যুগের স্ফুরণ ঘটে। হযরত সাদিক রহিমাহুল্লাহ-এর সময়ে রচিত হয়েছিল। এ সময়ই বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় ইলমে ক্বারাআতে কোরআন, ইলমে তাফসীর, ইলমে হাদীস, ইলমে ফিক্হ, ইলমে কালাম, অপরদিকে চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও রসায়ন ইত্যাদি বিদ্যা অস্তিত্ব লাভ করেছিল। জ্ঞানচর্চা এতটা প্রসার লাভ করেছিল যে, যার কাছে যা-ই চিন্তার খোরাক ছিল, তা-ই বাজারে বিকাতো। ফলে এক অদ্ভুত জ্ঞানপিপাসা সমাজে বিরাজ করছিল, এমনিতে জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে মহানবী ﷺ -এর উৎসাহ এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান ও চিন্তার পথে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা এ জ্ঞানগত ধারাসমূহের উৎপত্তির পথে প্রধান উদ্দীপক ছিল।

তাছাড়া, বিভিন্ন ক্ষেত্র ও গোষ্ঠী, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল প্রকারান্তরে তারা পূর্ব থেকেই কিছু নিজস্ব ধ্যান-ধারণার অধিকারী ছিল। এগুলোর মধ্যে পারসিক, মিশরীয় ও সিরিয় সভ্যতা ছিল তদানিন্তন সভ্যতাসমূহের কেন্দ্রবিন্দু। এ সব দেশের অমুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষ্যে ইসলামের শিক্ষাকে গভীরভাবে অনুধাবনকরতঃ গবেষণা, অনুসন্ধান ও মত বিনিময়ের জন্য তৎকালীন এই জজিরাতুল আরবে ব্যাপক হারে আগমন করতেন।

মুসলিম রাষ্ট্রনায়কদের বিজ্ঞান চর্চা

রাজকার্যে ব্যাপৃত থেকেও বিজ্ঞান চর্চার ঘটনা ইসলামী সভ্যতা ছাড়াও জগতের অন্যান্য ইতিহাসে বিরল না হলে হাতে গোনা মাত্র। কারণ, একটি পরিবার পরিচালনায় যেখানে গৃহকর্তাকে গলদঘর্ম হতে হয় সেখানে পুরো রাজ্য পরিচালনা চাট্টিখানি কথা নয়। এ কারণে রাজার কথা প্রজা সাধারণের মান্য করা ইসলামী শারিয়াতে অনেকটা বাধ্যতামূলক বটে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে রাজকার্য ছাড়াও নিরাপত্তা কিংবা আত্মমর্যাদার জন্যে সকল সময় বৈজ্ঞানিকদের সাথে উঠাবসা করা সম্ভব ছিল না।

পূর্বেকার রাজ আভিজাত্যবোধ ছিল এখনকার তুলনায় আরো বহু গুণে বেশী। বৈজ্ঞানিকদের সাথে সাধারণ কাতারে এসে জ্ঞান সাধনা করা তাদের পক্ষে তাই সহজে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন কতিপয় মুসলিম সুলতান ও খলীফাগণ, প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীবর্গ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেন্জামিন.ফ্রাংকলিন একাধারে বিজ্ঞানী, লেখক, রাষ্ট্রনায়ক,দার্শনিক ছিলেন। তাঁরা বিজ্ঞানীদের সাথে মেলামেশা করতেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে তাঁরা নিজেরাও বিজ্ঞান র্চ্চা করতেন।

ইসলামের সামাজিক সাম্যবাদই অনেক সময় রাজন্যবর্গকে সাধারণের কাতারে উদ্বুদ্ধ করে যার কারণে, জামা’আতের নামাযে আসতে একটু দেরী হলে সুলতানকে একটু আগে আসা গোলমের পিছনে কাতারে দাঁড়াতে হতো।

এসব নিরহংকার রাজণ্যবর্গরা নিজেরা বিজ্ঞান চর্চা ছাড়াও রাজ ভান্ডার থেকে আর্থিক সহায়তা করে  বিজ্ঞান বিকাশে বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

বিজ্ঞানানুরাগী সুলতান মাসউদ

 বিজ্ঞানানুরাগী সুলতান মাসউদ গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন, অত্যন্ত খুশী হয়ে একটি হাতির ওজনের পরিমাণ রৌপা বৈজ্ঞানিক আল-বেরুনীকে উপহার প্রদান করেন। আল-বেরুনী ছিলেন নিতান্ত গরীব বিজ্ঞানী। রাজানুগ্রহ ছাড়া তাঁর কোন আর্থিক অবলম্বন ছিল না।

দরিদ্র বিজ্ঞানী আলবেরুনীকে এক হাতী পরিমাণ ওজনের রৌপ্য উপহার!

 হতদরিদ্র বৈজ্ঞানিক আল-বেরুনীকে সুলতান মাসউদ খুশী হয়ে একদা এক হাতী পরিমাণ ওজনের রৌপ্য দান করেন। তাতে হতদরিদ্র আল-বেরুনীর মহাখুশী হয়ে সাগ্রহে দান গ্রহণ করার কথা। কিন্তু তা না করে বাহ্যিক সন্তোষ প্রকাশ করে সবটা রৌপ্যই তিনি রাজকোষে ফিরিয়ে দেন এই বলেঃ তাঁর এত ধন-সম্পদের কোন প্রয়োজন নাই।

স্পেনের সেভিল সুলতান মুতামিদ

সেভিলের সুলতান মুতামিদ আন্দালুসিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন। তাঁর বেগম ইতিমাদও একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন।

 রাজ কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে ৫০ খন্ডে সমাপ্ত  বিরাট বিশ্বকোষ রচনা!

স্পেনের বাজাজোরর শাসনকর্তা মুজাফ্ফর রাজ কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত থাকতেন। তিনি সর্বজ্ঞানের সমন্বয়ে ৫০ খন্ডে সমাপ্ত একটি বিরাট বিশ্বকোষ রচনা করেন। কত বড় পন্ডিত ব্যক্তি হলে এত বড় বিশ্বকোষ রচনা সম্ভব হতে পারে, তা সহজেই বোধগম্য।

জারাগোজা:  জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় স্পেনের শীর্ষস্থান

 স্পেনের জারাগোজার রাজ্যের সুলতান মুকতাদির বিল্লাহ্ নিজেই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মজলিসে যোগদান করতেন। মাত্র ৩টি জেলা নিয়ে গঠিত হলেও এই রাজই ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় স্পেনের শীর্ষস্থানীয়।

মুকতাদির বিল্লাহ্ (আবুল ফজর জাফর) নাম ধারণ করে খলীফা হিসাবে ক্ষমতাসীন হন। তিনি যে কেবল বিজ্ঞান সম্মিলনীতেই যোগদান করতেন তা-ই নয়, সাধারণ বৈজ্ঞানিকদের সাথে মিলেমিশে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে বসে গ্রহ-নক্ষত্রাদির পর্যবেক্ষণ কাজেই তাঁর অনেক সময় কেটে যেত। অঙ্কশাস্ত্রের মধ্যে জ্যোতিবিজ্ঞানেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। ধুমকেতুর প্রতিও তাঁর আকর্ষণ ছিল। ধুমকেতু সম্পর্কে তিনি কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।

 সুলতান আজদ-উদ-দৌলাহর উদ্যোগে বার্ষিক  জাতীয় বিজ্ঞান সভা!

সুলতান আজদ-উদ-দৌলাহ প্রতি বছর একটি ব্যাপক বিজ্ঞান সভা ডাকতেন। দেশের সর্বস্তরের জ্ঞানী-গুণী-বিজ্ঞানীগণ এই বৈজ্ঞানিক কনফারেন্সে যোগদান করতেন। এতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপর মনোজ্ঞ আলোচনা অনুষ্ঠিত হতো। সুলতান পদমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে আলোচনায় যোগ দিতেন।

রাজপ্রাসাদের উদ্যানে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা!

 সম্রাট শরফ-উদ-দৌলার জ্যোতিবিজ্ঞানের প্রতি এত আগ্রহ ছিল যে তাঁর রাজপ্রাসাদের উদ্যানে একটি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহাকাশ কেন্দ্র থেকে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির পর্যবেক্ষণ কার্য চলত। অনেক সময়ই আমীর স্বয়ং এই পর্যবেক্ষণ কার্যে যোগদান করতেন। বিখ্যাত গণিত শাস্ত্রবিদ আল-কুহী ছিলেন এর অধ্যক্ষ। অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যাঁরা এই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে কাজ করতেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আল-আস্তরলবী, আবু ইসহাক, ইবরাহীম ইবনে হিলাল, আবুল ওয়াফা প্রমুখ।

 শরফ-উদ-দৌলা ইয়েমেন প্রদেশের জন্যে একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক তালিকা প্রস্তুত করেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক ‘আল-ইথিল’ নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এতে পূর্বেকার আরবদের জ্যোতিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, সৃষ্টিবিজ্ঞান প্রর্ভতি সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার স্থান লাভ কর

খলিফা হারুন-উর রশিদঃ বায়তুল হিকমাহর প্রতিষ্ঠাতা

বায়তুল হিকমাহ, বাগদাদ আন্তঃধর্মীয় শান্তিপূর্ণ জ্ঞান-শিক্ষার অপূর্ণ সহাবস্থান ক্ষেত্র

আরব জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের এটা একটি নীতি ছিলঃ অন্যান্য ধর্মের মানুষের সাথে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস, বিশেষ করে আহলে কিতাবের সাথে অবস্থান। মুসলমানরা আহলে কিতাবের সাথে বসবাসকে নিজেদের দ্বীনের মূলনীতি বিরুদ্ধ বলে মনে করতেন না। তদানিন্তন আহলে কিতাবের মধ্যেও অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ছিলেন যারা নিছক বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা হিসেবে মুসলমানরা তাঁদের সাথে তাত্ত্বিক আলোচনা ও বিতর্ক করতেন।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত আব্বাসীয় খলিফা হারুণ-উর-রশিদ, খলিফা মামুন প্রমুখ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বায়তুল হিকমাহ ছিল আন্তঃধর্ম সম্প্রীতির উর্বর ভূমি। এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের অপূর্ব সমাবেশ ঘটতো। ফলে বহুজাতিক মেধার স্ফুরণ ঘটে আরব-ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইতিহাসে। বিশেষ করে বিজ্ঞানের ফুয়েল (জ্বালানী) খ্যাত গণিত বা অংকে বৈশ্বিক বিপ্লব ঘটে রোমান নামারালের প্রতিস্থাপকরূপে আরব-ভারতীয় (বাইনারী কোর্ড ০ এবং ১) গণিতের অপূর্ব সমন্বয়ে এরাবিক নামারালের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে যা ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লব ছাড়াও গণিত নির্ভর নিউটনীয় বল বিজ্ঞান, ম্যাক প্ল্যাঙ্কীয় কোয়ান্টাম বল বিজ্ঞানের উদ্ভবকে ত্বরাণ্বিত করে।

স্মরণযোগ্য যে, পনের শতক হিজরী উপলক্ষ্যে ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে লন্ডনে মুসলমানরা ইসলাম ফেস্টিবল পালন করে। এতদুপলক্ষ্যে লন্ডনের এক প্রভাবশালী পত্রিকা বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করে। নিবন্ধে বলা হয়, মুসলমানদের অর্জিত জ্ঞানের স্ফুরণ যদি ইউরোপে একশত বছর পূর্বে ঘটতো তাহলে ইউরোপী (প্রথম) শিল্প বিপ্লব ১০০ বছর আগেই সংঘটিত হতো। 

 ১. জাবির ইবনে হাইয়ান

প্রাচীনকালের কিমিয়া, তারপর আলকেমি আর বর্তমানে রসায়নশাস্ত্র। দুনিয়ার যত বিজ্ঞানী রসায়নশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন তাদের অন্যতম পুরধা হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান।

৭২০ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কিমিয়া তথা রসায়নকে যারা প্রকৃত বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেয়েছেন জাবির ইবনে হাইয়ান হলেন তাদের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করলেও রসায়নবিজ্ঞান নিয়ে তার অবদানই সর্বাধিক।

তিনি রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষণা করে অনেক বই-পুস্তক লিখেছেন। ‘বুক অফ কম্পজিশন অফ আল-কেমি’ তাদের অন্যতম। এছাড়া জাবির ইবনে হাইয়ান অন্যান্য বিষয়ের উপর প্রায় পাঁচশো’রও অধিক বই রচনা করেছেন।

রসায়নবিজ্ঞনের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যথা পরিস্রবণ,দ্রবণ, ভস্মীকরণ,বাষ্পীকরণ, প্রভৃতি তাঁরই আবিষ্কার। তিনি তাঁর গ্রন্থে ধাতুর শোধন, তরলীকরণ,লোহা মরিচা রোধক বার্ণিশ,লেখার কালি ও কাঁচ ইত্যাদি দ্রব্য প্রস্ততের প্রণালি ও বিধি সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

তিনি কুফায় একটি বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠা করে মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই গবেষণারত ছিলেন। জাবির ইবনে হাইয়ান রসায়নশাস্থের পরিপূর্ণতা দান করেন বিধায় তাকে রসায়নশাস্ত্রের ‘জনক’ বলা হয়। তিনি ৮১৫ ঈসাব্দে ইন্তেকাল করেন।

২. আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমি

ঋনাত্মক রাশির চিহ্ন বদল করে সমীকরণের একপাশ থেকে অন্যপাশে নেওয়ার পদ্ধতি যিনি প্রবর্তন করেছিলেন তিনি হলেন মুসা আর খারিজমি। ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের (বর্তমানে ইরান) খিভা প্রদেশের খোয়ারিজমি নামক জায়গাতে তিনি জন্মগ্রহন করেছে। তাঁকে গণিতশাস্ত্রের ‘জনক’ বলা হয় মূলত বীজগণিতের আবিষ্কারক হলেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর রচিত ‘হিসাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালাহ’ গ্রন্থের নামানুসারে বীজগণিত শাস্ত্রকে পরবর্তীকালে ইউরোপীয়রা আল-জেবরা নামকরণ করেন।

তিনি এ গ্রন্থে আট শতাধিক উদাহরণ সন্নিবেশিত করেন। সমীকরণ সমাধান করার ছয়টি নিয়ম তিনি আবিষ্কার করেন। গণিত বিষয়ের উপর তাঁর আরো অনেক বই রয়েছে। ‘কিতাবুল হিসাব আল আদাদ আল হিন্দী’ তাঁর পাটিগণিত বিষয়ক গ্রন্থ। এছাড়াও জ্যামিতি বিষয়ক তিনি অনেক বই লিখেছেন। তাঁর গণিতশাস্ত্র দ্বারা উমর খৈয়াম, লিওনার্দো, ফিরোনাসসি এবং মাস্টার জ্যাকবসহ আরও অনেকেই প্রভাবান্বিত হয়েছেন। আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যবরণ করেন

৩. ইবনে সিনাঃ Father of Modern Science.

ইবনে সিনা ছিলেন সর্ববিদ্যায় পারদর্শী। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তিনি বিচরণ করেন নি। মধ্যযুগের জ্ঞান বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে ইবনে সিনার অবদান অপরিসীম।

তবে চিকিৎসা শাস্ত্রে তার অবদান সবচেয়ে বেশি, তাই তাকে বলা হয় Father of Modern Science. ইবনে সিনা কেবল একজন চিকিৎসক ই ছিলেন না, তিনি একজন গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক ও বটে !

আরবরা তাকে অ্যাখ্যায়িত করেছে আল-শায়খ আল-রাঈতথা জ্ঞানীকুল শিরোমণি হিসেবে। আর পাশ্চাত্যে তিনি আভিসেনা(Avicenna) নামেই অধিক পরিচিত। 

ইবনে সিনাঃ আলোর কণাবাদের স্থপতি

 আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আবদুল¬াহ ইবনে সিনা আল বুখারী (৯৮০-১০৩৭ ঈসাব্দ) আলোর প্রকৃতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলোর কণাবাদেরই জন্ম দিয়ে বসেন। উল্লেখ্য,, আধুনিক বিজ্ঞানের আরেক স্থপতি আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর জীবনের ৫০টি বছর ধরেই এ প্রশ্নে ডুবে ছিলেন যে, আসলে আলোর কণাগুলি কি? এই প্রশ্নে তিনি ভাবতে শুরু করেন আলোর একমাত্রিকতা সম্পর্কে আইনস্টাইন বিশ্ব জগতের অগণিত বস্তুরাজির ১১৫টি পারমানবিক মাত্রার স্হলে মাত্র একক মাত্রায় নামিয়ে আনার চিন্তাটাই করেছিলেন যা পরবর্তীতে হিগস-বোসন কণার মধ্যে ইউরোপীয় বিজ্ঞান সংস্থা গত ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দেয়। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, আইনস্টাইন ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অনেক পূর্বে আবু আলী আল হুসাইন ইবনে সিনা আল আরাবি-ই আলোর কণাবাদের মাধ্যমে আলোর এককমাত্রিক উৎসের সূচনা করেছিলেন।

 ৪. হাসান ইবনে হাইসাম

ইউক্লিড আর টলেমি যেখানে বলেছিলেন যে, আলো চোখ থেকে বস্তুতে পড়ে বলেই আমরা দেখতে পাই; সেখানে একজন মুসলিম চক্ষুবিজ্ঞানী তাদের থিওরি হাতে কলমে ভুল প্রমাণ করলেন। সেই বিজ্ঞানীর নাম হলো হাসান ইবনে হাইসাম।

তিনি প্রমাণ করলেন,বাহ্যবস্তু থেকেই আলো আমাদের চোখে প্রতফলিত হয় বলে বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় তিনি ৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র,গণিত প্রভৃতি বিষয়ে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।

চক্ষুবিজ্ঞান বিষয়ক মৌলিক গ্রন্থ ‘কিতাবুল মানাযির’ তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। আধুনিক কালের বিজ্ঞানীরা গতিবিজ্ঞানকে তাদের আবিষ্কার বলে দাবি করলেও ইবনে হাইসাম এ বিষয়ে বহু পূর্বেই বিস্তারিত বর্ণনা করেছিলেন। মাধ্যাকর্ষণ বিষয়ে তিনি তাঁর গ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন।

স্যার আইজ্যাক নিউটনকে (১৬৪২-১৭১৭ খ্রি) মাধ্যাকর্ষণ সম্পর্কিত শক্তির আবিষ্কারক মনে করা হলেও ইবনে হাইসাম এ বিষয়ে প্রথম ধারণা দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তিনি ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন

৫. জাবির ইবনে সিনান আল বাত্তানী

পৃথিবীর এক বছর সমান যে ৩৬৫ দিন, ৫ ঘণ্টা, ৪৬ মিনিট,২৪ সেকেন্ড তা প্রথম হিসাব করেন জোর্তিবিজ্ঞানের জ্যোতি জাবির ইবনে সিনান আল বাত্তানী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর এই হিসাবের সাথে বর্তমান আন্তর্জাতিক হিসাবের পার্থক্য মাত্র ২৭ মিনিটের।

জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী জাবির ইবনে সিনান আল বাত্তানী ৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মেসোপোটেমিয়ার অন্তগর্ত মিশরের বাত্তান নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান এর উপর তিনি চারটি বই রচনা করেছেন যেগুলো জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে আলোর দিশারী হিসেবে খ্যাত। মুসলিম এই মনীষী ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ইহলোক ত্যাগ করেন।

৬.  আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া আল রাযিতাঁর নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু বকর, পিতার নাম যাকারিয়া। তিনি আল-রাজি নামে অধিক পরিচিত। ৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।জানা যায়, সেই সময়কার সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শল্যচিকিৎসাবিদ ছিলেন তিনি। তৎকালে তাঁর সুনাম ও সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ থেকে অনেক রোগী তাঁর নিকট আসত। তাঁর অস্ত্রোপচার পদ্ধতি ছিল গ্রীকদের থেকেও উন্নত।

তিনি মোট দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে শতাধিক হলো চিকিৎসা বিষয়ক। ‘আল জুদাইরি ওয়াল হাসবাহ’ এবং ‘আল- মানসুরি’ বই দুইটি আল রাযিকে চিকিৎসাশাস্ত্রে অমর করে রেখেছে।

তিনি হাম, শিশু চিকিৎসা, নিউরোসাইকিয়াট্রিক ইত্যাদি চিকিৎসা সম্পর্কে নতুন মতবাদ প্রবর্তন করেন। ৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি হইলোক ত্যাগ করেন।

৭. আল বিরুনি

বুরহানুল হক আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল বিরুনি; যিনি সংক্ষেপে আল বিরুনক নামে পরিচিত। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে খাওয়ারিযমের নিকটবর্তী আল বিরুন নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেনআল বিরুনি ছিলেন মধ্যযুগীয় শ্রেষ্ঠ মুসলিম পন্ডিত, মহাজ্ঞানী ও নিষ্ঠাবান গবেষক তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী বড় দার্শনিক ছিলেন। গণিত, জ্যোতিষশাস্ত্র, পদার্থ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

এছাড়া তিনি প্রসিদ্ধ ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক পঞ্জিকাবিদ,চিকিৎসাবিজ্ঞানী,ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক ছিলেন। স্বাধীন চিন্তা, মুক্ত বুদ্ধি,সাহসিকতা,নির্ভীক সমালোচনা ও সঠিক মতামতের জন্য তিনি যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।পৃথিবীখ্যাত ৮জন সফল ব্যক্তির অনুপ্রেরণার গল্প | পড়তে ক্লিক করুন তিনি ভূগোলের অক্ষরেখার পরিমাপ নির্ণয় করেন। তাঁর লিখিত অনেক গ্রন্থ রয়েছে৷ তন্মধ্যে ‘আল আছারুল বাকিয়্যাহ- আনিল কুরুন খালিয়্যাহ’ গ্রন্থটি প্রসিদ্ধ। এ গ্রন্থে তিনি বর্ষপঞ্জি, গণিত,ভূগোল, আবহাওয়াবিজ্ঞান ও চিকিৎসাসহ নানা বিষয় নিয়ে বর্ণনা করে।

তিনিই প্রথম প্রমান করেন যে,পৃথিবী গোলাকার। পৃথিবীর গোলাকার মানচিত্র তাঁর রচিত। তিনি ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

৮. ওমর খৈয়াম

উমর খৈয়াম; পুরো নাম উমর ইবনে ইবরাহীম আল খৈয়াম। ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন তিনিতিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণির গণিতবিদ।

তাঁর ‘কিতাবুল জিবার ওয়াল মুকাবালা’ গণিতশাস্ত্রের একখানি অমর গ্রন্থ। ঘণ সমীকরণ এবং অন্যান্য উন্নতশ্রেণির সমীকরণের পদ্ধতির বিশ্লেষণ এবং সংজ্ঞানুসারে এগুলোকে শ্রেণিভুক্ত করে উমর খৈয়াম বীজগণিতের অসাধারন অগ্রগতি সাধন করেন।

এ ব্যাপারে তিনি গ্রিকদের থেকেও বেশি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। পাটিগণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপরও তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ১১২২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবর করেন।। 

 ৯. ডাঃ এ পি জে আবুল কালাম আজাদ

এই উপমহাদেশের ‘মিসাইলম্যান’ খ্যাত ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী ডাঃ এ পি যে আব্দুল কালাম; যিনি ত্রিশটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেছেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে এবং পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ জীবনের শেষকালে গোটা ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি জ্ঞান সাধনায় নিজেকে এমন ভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন যে মৃত্যুর পূর্বকাল অব্ধি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।

‘’উইং অফ ফায়ার’ তাঁর লেখা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বই। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তিঅনেকেরই জানাঃ ‘Dream is not what you see in sleep, is the thing that doesn’t let you sleep’.

তিনি অনেকগুলা গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি ১৯৩১ সালে ভারতের তামিলনাড়ুতে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে এই মনীষীর মৃত্যু হয়।

 আলহামদুলিল্লাহ, ইতিমধ্যে মুসলিম উম্মাহ বেধড়ক নির্যাতনের মুখে আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে যা সত্যিই মুবারকবাদযোগ্য

১০. কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারক তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মান চিকিৎসাবিজ্ঞানী শাহীন-তুরেসী

বিশ্ব বিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি ফাইজার এবং জার্মান ভিত্তিক বায়োএনটেক, ৯০% সফলতা নিয়ে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা করেছে। কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে থমকে যাওয়া পৃথিবী আবার সচল হবে, স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ফিরে আসবে বলে দাবি করেছেন জার্মান ভিত্তিক বায়োএনটেক সিইও ড. শাহীন।

কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পুরো দায়িত্বে ছিলেন বায়োএনটেক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা শাহীন-তুরেসী নামক তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মান চিকিৎসক/ বিজ্ঞানী, এক মুসলমান দম্পতি। মাত্র কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বায়োএনটেক কোম্পানিটি ইউরোপে খুব একটা পরিচিত না হলেও করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠেছে। ড. উগার শাহীন এবং তার স্ত্রী ড: উজলেম তুরেসি মূলত ক্যান্সার সেল নিয়ে গবেষণার জন্য বায়োএনটেক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৫৫ বছর বয়সী ড. উগার শাহীন তুর্কির ইস্কেডেরুন শহরে জন্মগ্রহণ করেন।

মাত্র ৪ বছর বয়সে ইস্কেডেরুন শহর থেকে অভিবাসী হিসাবে পরিবারের সাথে জার্মানিতে বসতি স্থাপন করেন। বাবা ফোর্ড গাড়ী ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে চাকুরী করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। ছোট সময় থেকেই ড: শাহীনের ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। নতুন অভিবাসী হিসাবে অনেক কষ্টে পিজিসিয়ান হলেন অতঃপর কর্মস্থান থেকেই ১৯৯৩ সালে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

এই দম্পতি বায়োএনটেক নামক একটি গবেষণা কেন্দ্র খুলেছিলেন যেখানে মূলত ক্যান্সার সেল নিয়ে গবেষণা করা হতো।

মাত্র দুই বৎসর আগে জার্মানির একটি সেমিনারে মানব দেহের কোষে অবস্থিত আরএনএ সেল সম্পর্কে গবেষণামূলক তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেন ড. শাহীন। এই অআরএনএ সেল সম্পর্কিত তথ্যাদি শাহীন দম্পতিকে করোনা কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন আবিস্কারে উদ্বুদ্ধ করেছিল।  এখানেই পরিচয় হয়েছিল আমেরিকান ফাইজার কোম্পানির সিইও মি. আলবার্ট ব্রউলার এর সাথে এবং এই কোম্পানীকে শাহীন দম্পতি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন করোনা ভ্যাকসিক নিয়ে কাজ করতে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের শুরুতে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারী ছড়িয়ে পরলে ফাইজার কোম্পানির সিইও মি. আলবার্ট ব্রউলার, বায়োএনটেক কোম্পানির সিইও ড. শাহীনের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গবেষণা শুরু করেন।

 ড. শাহীনের স্ত্রী ড. উজলেম তুরেসি জার্মানিতে জন্ম নেয়া একজন চিকিৎসক বাবার সন্তান, তার পরিবার তুর্কির ইস্তানবুল থেকে জার্মানিতে বসতি স্থাপন করেছিলেন। স্বামী স্ত্রী দুজনেই ডক্টরেট ডিগ্রিধারী তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক। তাদের প্রতিষ্ঠিত বায়োএনটেক কোম্পানির বাজার মূল্য বেড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে এইচআইভি এইডস ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য বিল এন্ড মেলিন্ডা গেইটস ফাউন্ডেশন বায়োএনটেক কোম্পানিকে ৫৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। কোম্পানিতে বর্তমানে ১৪০০ গবেষক কর্মরত রয়েছেন। বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে ড. শাহীন তাদের প্রতিষ্ঠিত ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র বায়োএনটেক ইউরোপের সর্বোবৃহহতম ঔষুধ তৈরীর কোম্পনিতে রূপান্তর করাই তাদের স্বপ্ন বলে জানিয়েছেন। এর আগে ২০১৯ সালে ড. শাহীন ইরানের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক মুস্তফা এওয়ার্ড জিতেছিলেন। “মুস্তফা এওয়ার্ড” বিশ্বব্যাপী মুসলমান গবেষকদের মাঝে সর্বোচ্চ সম্মানিত এওয়ার্ড বলে গণ্য করা হয়। (তথ্য সূত্রঃ https://usanewsonline.com/)।

প্রাচীন বিশ্ব সভ্যতার স্মারক গ্রন্থের অনুবাদে মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানীদের ভূমিকা

প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞান সংরক্ষণে মুসলিম বিজ্ঞানীদের ভূমিকা

“গ্রীক বিজ্ঞানের নাম-গন্ধও যখন বিলুপ্ত প্রায়, তখনই মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের আবির্ভাব ও পূর্বেকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুসন্ধান বিজ্ঞান জগতে বিধাতার এক আশীর্বাদই বলতে হবে। মুসলমানদের পূর্বে বিজ্ঞান ছিল অজানা অন্ধকারে নিমজ্জমান প্রায়। গ্রীকদের বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের অনেকগুলিই অধুনা লুপ্ত। আরবী অনুবাদই শুধু পূর্বেকার বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার ফল জগতকে শিক্ষা দিচ্ছে। গ্রীক বিজ্ঞানের এত উন্নতির সাক্ষ্য হিসাবে রয়েছে মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের অনুবাদ কার্য এবং তারই উপর নির্ভর করে ইউরোপের বর্তমান বৈজ্ঞানিক অভিযান।

গ্রীক বৈজ্ঞানিক টলেমির ‘টেট্রাবিবলস’ গ্রন্থ অনুবাদ

আবু ইয়াহিয়া আল-বাতরিক গ্রীক বৈজ্ঞানিক টলেমির ‘টেট্রাবিবলস’ গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তিনি তৎকালীন বিজ্ঞ সমাজে অঙ্কশাস্ত্রবিদ হিসাবে প্রশংসা অর্জন করেন। শুধু অঙ্কশাস্ত্রবিদ নয়, জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে তিনি পূর্বেই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপরও অনেকগুলো বই লিখেন। কারণ তিনি নিজেও বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ‘টেট্রাবিবলস’ অনুবাদ করেন

ভারতীয় প্রাচীন ‘সিন্দহিন্দের’ আরবী অনুবাদ

খলিফা আল মানসুর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ধার্মিক মুসলমান হয়েও তিনি ছিলেন ওমর ইবনে খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মতো আন্তঃধর্মীয় সহনশীল চরিত্রের মুসলমান। যারফলে, ইয়াহূদী, হিন্দু, খৃস্টান প্রভৃতি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মেধার স্ফুরণ ঘটেছিল খলিফার দরবারে। মুক্ত মনে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা থেকে বিজ্ঞানের গ্রন্থানুবাদ, মূলগ্রন্থ সংগ্রহ করে জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকদেরকে নিশ্চিন্ত-নিবিষ্ট মনে বিজ্ঞান চর্চার অপূর্ব সুযোগ লাভ করায় দলে দলে আর্য-ইউরোপীয় বহুমুখী জ্ঞান অন্বেষীদের ভিড় জমতো রাজ দরবারে। বিশেষ করে বিজ্ঞানী ইসহাক আল-ফাজারীর প্রচেষ্টায় ভারতীয় বৈজ্ঞানিকদের বার বার বাগদাদ গমন সম্ভব হয়।

আল-ফাজারীর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র দ্বিতীয় আল-ফাজারী খলীফা মনসুরের আদেশে সর্বপ্রথম ৭৭২-৭৭৩ খৃস্টাব্দে ‘সিন্দহিন্দের’ আরবী অনুবাদ করেন। আল-বেরুনীর মতে এর পূর্বেই ৭৭০-৭৭১ খৃস্টাব্দে ‘‘সিন্দহিন্দের’ আরবী অনুবাদ হয়ে গিয়েছিল।

প্রকৌশল বিজ্ঞানে মুসলমান

আল নও-বখত (মৃত্যু ৭৭৫ খৃস্টাব্দে) জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ পারদশী ছিলেন। তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এর নাম হলো ‘কিতাবুল আহ্কাম’। ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় যে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল, বাগদাদের ভিত্তি স্থাপনই এর প্রমান।

আল-ফাজারী: জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল যন্ত্র: আস্তরলবরে আবিস্কারক

জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল যন্ত্র আস্তরলবসহ অন্যান্য জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত উন্নতমানের যন্ত্র খলীফা মনসুরের সময় নির্মাণ করা হয়। প্রথম আস্তরলবপ্রস্তত করেন একজন মুসলমান বৈজ্ঞানিক। নাম আল-ফাজারী। এ প্রসঙ্গে ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ড্রাপার বলেন, “আরবগণ নভোমন্ডলে যে অম্লান হস্তছাপ রাখিয়াছেন, তাহা যে কোন ব্যক্তি ভূ-মন্ডলের নক্ষত্র সম্বন্ধীয় জ্ঞান আহরণ কালে উপলব্ধি করিতে পারিবেন”।

মাফাতাহিল উলুম: পৃথিবীর প্রাচীনতম সর্ব বৃহদাকার বিশ্বকোষ (এনসাইক্লোপিডিয়া)

 দ্বিতীয় মনসুরের পুত্র খলীফা দ্বিতীয় নুহের মন্ত্রী আবুল ওতাব ছিলেন আবদুল্লাহ্রর পৃষ্ঠপোষক। তিনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম এবং সর্ব প্রাচীন ‘মাফাতাহিল উলুম’ নামক এক বৃহদাকার বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া প্রণয়ন করেন। (সূত্রঃ ১. বিজ্ঞানে মুসলমানের দান ঃ এম. আকবর আলী, পৃষ্ঠা ১৫৭)।  তিনি পুস্তক বিক্রেতা ছিলেন। সমাজ ছিল উচ্চস্তরের শিক্ষিত লোকের সঙ্গে। তিনি নিজেও উচ্চশিক্ষিত বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘ফিহরিস্ত’ নামক একটি প্রামাণ্য ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ রচনা করেন।

  বিখ্যাত বিদ্বান ব্রকেলম্যান ‘ফিহরিস্ত’ সম্বন্ধে মন্তব্য প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আবুল-ফারাজ’ এই ফিহরিস্তে বা তালিকায় তখনকার দিনের সমস্ত আরবী পুস্তকের, তা মৌলিক রচনাই হোক বা অনুবাদই হোক-একটি তালিকা দিয়েছেন। এতে তিনি প্রথম বিভিন্ন প্রকারের লিখন পদ্ধতির কথা বর্ণনা করেন, বিভিন্ন ধর্মের প্রেরিত পুস্তকের কথা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

গ্রীনউইচ মান সময়রে ধারণা প্রতিষ্ঠায় মূসা ভ্রাতৃত্রয়

দ্রাঘিমা ও অক্ষরেখার কেন্দ্রস্থ গ্রীনউইচ মান সময় তৎকালীন পৃথিবীতে অজ্ঞাত ব্যাপার ছিল। বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমার কল্পনা করে লোহিত সাগরের তীরে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর আকার ও আয়তন সঠিকভাবে নির্ণয় করেন। উল্লখ্যে, আরব বৈজ্ঞানিকগণ যখন পৃথিবীর সঠিক পরিধি ও আয়তন আবিষ্কার করে ফেলেছেন, তখন অনারব বৈজ্ঞানিকগণ এত পিছনে যে, পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্ত সমতল না চেপ্টা তাই নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন।

‘ফারাস্তুন’ একটি আরব বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ

‘ফারাস্তুন’ নামক মধ্যযুগে আরব বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে গোলকের পরিমাপ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গণিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এবং জ্যোতিবিজ্ঞানেও বহু গ্রন্থ পাওয়া যায়।

কর্ডোভা লাইব্রেরী

 স্পেনের খলীফা আবদুর রহমানের জনকৈ পুত্র। যদিও তিনি খলীফা ছিলেন তবু তাঁকে ‘গ্রন্থকীট’ বলা হতো। তাঁর কর্ডোভার লাইব্রেরীতে ৪ লক্ষাধিক গ্রন্থ সংগৃহীত হয়। প্রত্যেক গ্রন্থ তিনি যত্ন সহকারে পাঠ করে পার্শ্বে টীকা লিখে রাখতেন।

বহিবিশ্বের সঙ্গে সর্বপ্রথম কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন

 আরব শাসকদের মধ্যে খলীফা হারুনুর-রশিদই সর্বপ্রথম বহিবিশ্বের সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এজন্যে উভয় পক্ষের মধ্যে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ বহু মূল্যবান ইপঢৌকন বিনিময় হয়। তিনি ফ্রান্স, চীন প্রভৃতি দেশে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।খলীফা হারুনুর-রশিদ তাঁর বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ ফরাসী সম্রাট শালিমেনের নিকট একটি অদ্ভুত ঘড়ি উপঢৌকন দেন।


চীন-আরব মুসলমি আন্তঃ বৈজ্ঞানিক সর্ম্পক

মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর বিজ্ঞান পুস্তকসমূহ ক্রমান্বয়ে পরিপক্কতা লাভ করে। ফলে চীনের বীজগণিত ও ত্রিকোনমিতি প্রভৃতিতে আরবদের সংখ্যা বিজ্ঞানের প্রতিফলন ঘটে।

   জ্ঞান অন্বেষণে আরব জ্ঞানী-গুণীদের বিশ্ব জয়

সারাসিনরা ৭১১ খৃস্টাব্দে স্পেন অধভিুক্ত করে পরর্বতী বছর র্অথাৎ ৭১২ খৃস্টাব্দে সিন্ধুদেশ জয় করে ভারতে প্রবেশ করে। ৭২০ খৃস্টাব্দে ষ্পেনের পূর্ণ বিজয় সমাপ্ত করে আরবরা ফ্রান্সের আলমাস লোরেন প্রদেশের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের ২টি প্রদেশ অধকিার করে নেয়। ৭৬২ খৃস্টাব্দে বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আরব রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। ৭৮৬ খৃস্টাব্দে বাগদাদের হারুনুর-রশিদ আরব সাম্রাজ্যের  খলীফা হন এবং তাঁর খিলাফতকালে সারাসিন সভ্যতা ও সাম্রাজ্যের পরম বিস্তৃতি লাভ করে।

আরব অভিযাত্রীর ভারতে প্রবেশ

 ৭১২ খৃস্টাব্দে আরব অভিযাত্রীরা ভারতে প্রবেশের পর আর্যদের জ্ঞান-ভান্ডারে যা ছিল, তা আহরণে মনোনিবেশ করেন। এইভাবে গ্রীক, রোমান ও পারস্য সভ্যতাগুলোর নিকট হতে অবিরত জ্ঞান আহরণের জন্যে মুসলিম জ্ঞান অন্বেষীরা বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।

 বাগদাদের খলীফা হারুনুর-রশিদের নেতৃত্বে পরিচালিত সারাসিন সভ্যতা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারই অংশ হিসাবে খাইবার পাসের স্থলপথেই আরব অভিযাত্রীরা ভারতে প্রবেশ করে।

আরব অভিযাত্রীর বাংলাদেশে প্রবেশ

আরব মুসলিম সভ্যতা চট্টগ্রামের নৌপথেও বাংলাদেশে প্রবেশ করার প্রমাণ আছে। ৮০৯ খৃস্টাব্দে খলীফা হারুনুর-রশিদের মৃত্যু হয়। কিন্তু আরব সভ্যতার বিজয় অভিযান অব্যাহত থাকে।

মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রযাত্রার প্রারম্ভকাল

একথা সত্য নয় যে, আরবরা সপ্তম শতাব্দীর শুরু থেকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, বিজ্ঞান সাধনায় মনোযোগ দিতে পারেননি বরং অষ্টম শতাব্দী থেকে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা শুরু হয়।

প্রকৃতপক্ষে ইসলাম জন্মই নিয়েছিল মধ্যযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থান ক্রমান্বয়ে গারে হেরা থেকে>দারুল আরকাম> আসহাবে সুফফা> বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ> স্পেনের কর্ডোবার আল হামরা> মিশরের কায়রো আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরবর্তীতে ভারতে আলী গড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার বিস্তৃতি লাভ করে। 

সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস!

মূসা আল খাওয়ারিজমী এর সংর্স্পশে মূসা ভ্রাতৃত্রয়, মূসা ভ্রাতৃত্রয় এর সংর্স্পশে সাবিত ইবনে কোরা, সাবিত ইবনে কোরা এর সংর্স্পশে  মিনাস হুমায়ন, মিনাস হুমায়ন এর সংর্স্পশে ইবনে ইসহাক, ইবনে ইসহাক এর সংর্স্পশে দ্বিতীয় ইবনে হুমায়ন সাবিত, ইবনে হুমায়ন সাবিত এর সংর্স্পশে ইব্রাহীম ইবনে সিনান, ইব্রাহীম ইবনে সিনান এর সংর্স্পশে ইউসুফ আলঘুরী নামক জগদ্বখ্যিাত আরব মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবির্ভাব। একেই বলা “সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস”

সাবিতের রাজকীয় সুবিধা লাভে মূসা ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব বদন্যতা

হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয় সহমর্মিতা ছিল তৎকালীন মুসলিম বিজ্ঞানীদের চিন্তা-চেতনা যার প্রতিফল দেখা যায় জগদ্বিখ্যাত অআরব বিজ্ঞানী সাবিতের রাজকীয় সুবিধা লাভে মূসা ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব বদন্যতা, সহযোগিতা।

উল্লেখ্য, বাগদাদের নতুন খলীফা মুতাজিদ বিল্লাহ মুসা ভ্রাতৃদের প্রধান আবু জাফর মুহাম্মদের সুপারিশে বৈজ্ঞানিক সাবিতের জন্যে রাজকীয় সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। মুসলিম বৈজ্ঞানিকগণ সাধারণভাবে অঙ্ক ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করেন। সুতরাং বিজ্ঞানে যারা বিশেষ পারদর্শী হয়েছিলেন, তাঁরা সাধারণত গ্রীক ভাষায় বিদ্বান ছিলেন। সাবিত ইবনে কোরা গ্রীক এবং সিরিয়ান ভাষায় পরিপক্ক ছিলেন। তাছাড়া, অঙ্ক-বিশেষভাবে জ্যামিতিতেও তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি দর্শন ও অঙ্কশাস্ত্রের মৌলিক গবেষণায় বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন। অঙ্ক ও জ্যামিতিতে তিনি এত সুখ্যাতি লাভ করেন যে, সাধারণভাবে তাঁকে মনে হতো যে, তিনি আরবের শ্রেষ্ঠ জ্যামিতিবিদ। তাঁর সমসাময়িক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্যতম পারদর্শী বৈজ্ঞানিক ইসহাক ইবনে হুনায়ন ইউক্লিডের জ্যামিতির আরবী অনুবাদ করেন।

খলীফা হারুনুর-রশিদ সম্বন্ধে অধ্যাপক হিট্টি বলেন, বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন প্রাচ্যের হারুনুর-রশিদ এবং পাশ্চাত্যের শালিমেনকে লইয়া নবম শতাব্দী পরিক্রমা সূচনা করে। এই দুইজনের মধ্যে আবার হারুন নিঃসন্দেহে অধিক শক্তিশালী এবং উন্নত কৃষ্টির অধিকারী ছিলেন।

বায়তুল হিকমা বা ‘জ্ঞান-নিবাস প্রতিষ্ঠা

হারুনুর-রশিদ তা আরো সম্প্রসারণ করেন। হারুনুর-রশিদ বায়তুল হিকমা বা ‘জ্ঞান-নিবাস’ নাম দিয়ে বাগদাদে একটি গবেষণাগপার স্থাপন করেন। দেশ-বিদেশের বহু কবি, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, জ্যোতিবিদ, জ্যোতিষবিদ, সাহিত্যিক ও চিকিৎসাবিদ তাঁর রাজসভায় স্থান লাভ করতেন। তম্মধ্যে ব্যাকরণবিদ আসমাই ও শফি, চিকিৎসাবিদ জিবরাইল, অনুবাদক হাজ্জাজ এবং কবি আবু নোরায়েমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  পিতামহ খলীফা মনসুর বিভিন্ন ভাষায় বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করার জন্যে যে অনুবাদ বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

খলীফা হারুনুর-রশিদ গ্রীক ও ভারত থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থ গুলো সংগ্রহ ও অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। খৃস্টাপূর্ব ৩৩০-২৬০ অব্দের ইউক্লিডের নাম যখন পৃথিবী ভুলে গিয়েছিল, কতগুলো গল্পগুজবের মধ্যেই তাঁর অপ্রমাণিত জীবন ঘুমিয়ে ছিল, হারুনুর-রশিদই তাঁর চামড়ার কাগজের পুটলিতে বাঁধা জরাজীর্ণ বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে খুঁজে বের করেন।

খলীফা হারুনুর-রশিদঃ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণ পুরুষ ইউক্লিডের দূর্লভ পান্ডুপিলির  সুরক্ষক

তখনকার সময়ের অন্যান্য প্রাচীন জ্ঞান-গ্রন্থগুলোর মত ইউক্লিডের গ্রন্থও চামড়ার কাগজে ছোট ছোট পুস্তকাকারে খন্ড খন্ড আকারে লিখিত ছিল। উক্লিডের মৃত্যুর পর তার পান্ডুলিপিগুলো কেউ খুলে দেখেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ যে ইউক্লিডকে ছাড়া আজকের আধুনিক সভ্যজগতের বিজ্ঞান এক পদও অগ্রসর হতে পারে না, ইউরোপ সেই ইউক্লিডের জন্যে সে দিন কোনরূপ মাথা ঘামায়নি। তার পরিচয়ের জন্যে কেউ কোনদিন প্রয়াস চালাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। তিনি গ্রীক না মিসরীয় ছিলেন, এ সম্বন্ধে এখনও সঠিকভাবে কিছুই জানা যায় না। অনেকেই বলেন, তিনি জন্মগ্রহণ করেন মিসরে। তাঁর কর্মজীবন চলে আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং তিনি জ্ঞান লাভ করেন এথেন্সে।

খলীফা হারুনুর-রশীদই বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ইউক্লিডের বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো পূনরুদ্ধার করে আরবী ভাষায় অনুবাদ করে তাঁকে পূনরুজ্জীবিত করেন। তিনি যদি পৃথিবীর সামনে ইউক্লিডকে তুলে না ধরতেন আর আধুনিক বিজ্ঞান জগতে তাঁর বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো যদি অজ্ঞাতই থেকে যেতো তাহলে, আধুনিক বিজ্ঞানের গতি স্তিমিত হয়ে পড়তো।

খলীফা মামুন প্রতিষ্ঠিত বায়তুল হিকমা

 খলীফা হারুনুর-রশিদ বিজ্ঞান গবেষণার জন্য যে জ্ঞান-নিবাস কার্যালয়টি স্থাপন করেছিলেন, খলীফা মামুন তা আরো সম্প্রসারণ করেন। এর নাম ছিল ‘বায়তুল হিকমা’। এতে ছিল বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার ও অনুবাদ কার্যালয়। এখানে পারসিক, হিন্দু, আরবীয়, গ্রীক ও খৃস্টান জ্ঞান অন্বেষীরা শিক্ষা, গবেষণা ও অনুবাদ কার্যে নিয়োজিত থাকতেন। হুনায়ন-ইবনে ইসহাক নামক জনৈক বিখ্যাত শিক্ষাবিদকে খলীফা এর তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন।

দেশী-বিদেশী জ্ঞানগর্ভ দূর্লভ গ্রন্থাদি উদ্ধারের পুরস্কার গ্রন্থের সম-ওজনের স্বর্ণমুদ্রা!

খলীফা বহু দূর-দূরান্তরে প্রতিনিধি প্রেরণ করে। নানা দেশের পুরাতন অমূল্য গ্রন্থাদি উদ্ধার করেন। সংগ্রহকারীদেরকে বিপুলভাবে উৎসাহিত করার জন্যে প্রত্যেক গ্রন্থের সম-ওজনের স্বর্ণমুদ্রা পারিশ্রমিক দিতেন।

সেমতে, আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষা নিকেতনের অমূল্য লিপিসমূহ, গ্রীসের বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থাদি এবং পারস্য ও ভারতীয় দূর্লভ গ্রন্থাবলী বাগদাদে আনয়নপূর্বক সুযোগ্য বিশেষজ্ঞ দ্বারা অনুদিত ও সম্পাদিত হতে থাকে। লিউকের পুত্র কোস্টারের তত্ত্বাবধানে হুনায়ন ঈশা, হাজ্জাজ প্রমূখ মনীষী গ্যালেন, প্যাল, ইউক্লিড ও টলেমির চিকিৎসা, জ্যোতিবিদ্যা, অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থাবলী এবং প্লেটো ও এরিস্টটলের দর্শন গ্রন্থসমূহ সংগ্রহ করে আরবী ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করা হয়। মানকা ও দুবান নামক দুইজন হিন্দু ও মাহ্য়া নামক জনৈক পারসিক সংস্কৃত ও পারসী ভাষায় গ্রন্থাবলী আরবীতে অনুবাদ করেন। এই সব অনুবাদ কার্যের ফলে সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

  “এই সকল মনীষীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপের দেশসমূহ তাদের নিজস্ব  বিস্মৃত গ্রীক জ্ঞান বিজ্ঞানের নিদর্শনাবলীর সহিত পূণঃ পরিচিত হয়।”

খলিফা আল মামুনঃ  প্রথম মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (Space observatory Center) প্রতিষ্টাতা  

খলীফা মামুন নিজে জ্যোতিবিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি বাগদাদের নিকটবর্তী সামশিরাতে একটি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।১ জ্যোতিবিজ্ঞান গবেষণার জন্যে ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (Space observatory Center )

‘সুরত আল-আরদ

জ্যোতিষশাস্ত্র ছাড়াও গণিত, ভূগোল, চিকিৎসা, রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানের বহু মৌলিক দিক আবিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিখ্যাত, গণিতজ্ঞ, জ্যোতিবিজ্ঞানী ও ভূগোল বিশারদ মুহাম্মদ বিন-মুসা আল খাওয়ারিজমী তাঁর ‘সুরত আল-আরদ’ গ্রন্থে চন্দ্র গ্রহণ, সূর্য গ্রহণ, বিষুব রেখা ও ধুমকেতুর গতিপথ নির্ণয় করেন।

দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও নৌ-কম্পাস 

আবুল হাসান নামক জনৈক আরব বৈজ্ঞানিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও নৌ-কম্পাস যন্ত্র আবিষ্কার করেন।

‘দাখাল আল আয়ান’ 

খাওয়ারিজমীর বিশ্ববিখ্যাত বীজগণিত ‘এলমূল আল-জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ গ্রন্থ ষোড়শ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে সমাদৃত ছিল। সেই যুগের বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ উহান্নার ‘দাখাল আল আয়ান’ ছিল চক্ষুরোগ নিবারণের তথ্যপূর্ণ অমূল্য গ্রন্থ।

 প্রতি মঙ্গলবারে আলোচনা

 খলীফা মামুন বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের নিয়ে প্রতি মঙ্গলবারে আলোচনা সভায় বসতেন। আবু তাম্মাম ও আবু মাতাহিয়া ছিলেন তাঁর সভাকবি।

 

 দ্বিতীয় খন্ড

١١٠- كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ ۗ 

তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত,যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে (সূরাহ আলে ইমরান, আয়াতঃ ১১০)। 

Ye are the best of peoples evolved for mankind enjoining what is right forbidding what is wrong and believing in Allah. 

ভূমিকাঃ বলা হয়ে থাকে, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সেদিন থেকে শুরু যে দিন মানব মনে সত্যকে জানার আগ্রহ জেগেছিল। সেই আদি কালের অতি সাধারণ, গ্রাম-শহর-বন্দরের নিরীহ প্রকৃতির সহজ-সরল মানুষ সকালে সূর্য উদিত হয়ে সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়া, আবার সন্ধ্যার আকাশে মিটিমিটি তাঁরার হাসি, কখনও বাঁকা নতুন চাঁদ, কখনও ধীরে ধীরে তা বড় হয়ে পূর্ণিমায় রূপ নিয়ে সকালে  আবার আকাশে মিলিয়ে যেতে দেখে, কখনও নীলিম আকাশে ডানা মেলে পাখিদের উড়ে বেড়ানো দেখে, কখনও নদীতে সাগরে জোয়ার দেখে, কখনও ভাটা দেখে, কখনও আকাশে অঝোরে ঝড়-বৃষ্টি-মেঘ হতে দেখে, কখনও আকাশে সাত রঙের রঙধনু দেখে, কখনও ঘন পল্লবে পল্লবিত গাছ-পালা, জীব জন্তু-কীট-পতঙ্গ, পাখ-পাখালির সরব উপস্থিতি দেখে এসব কিভাবে আসল, কেন আসল ইত্যকার ভেবে কূল কিনারা খুঁজে না পেয়ে এগুলি ছিল, আছে, হয়তো থাকবে- এ বাস্তবতা মেনেই আবহমান কাল ধরে জীবন অতিবাহিত করে আসছিলেন। অতঃপর কিছু অনুসন্ধানুৎসু মানুষ যাঁদের সায়েন্স ফিকশনিস্ট বলা হয় তারা ভাবতে শুরু করেন আমরাও কি পারি না ডানা মেলে অআকাশে উড়তে? এ ভাবনা থেকে বিজ্ঞান মনস্ক এক মুসলিম  বানালেন এক মস্ত বড় ডানাওয়ালা ঘুড়ি জাতীয় বস্তু এবং উঁচু স্থান থেকে ডানাসহ উড়াল দিলেন-আধুনিক বিমান প্রযুক্তির শুরু এখান থেকেই বলে জনমনে বিশ্বাস।

সেই প্রাচীন কালে জনমনে প্রশ্ন জাগে, হাতের কাছে যা আছে, আশে পাশে যা আছে এসব বস্তুর মধ্যে কী অআছে, কিভাবে তৈরি-এ প্রশ্ন থেকে প্রাচীন গ্রীসের এক বিজ্ঞানমনস্কের মনে ধারণা জন্মে অ্যাটমের। তৎপরবর্তীতে অ্যারিস্টটল, তৎপরবর্তীতে জাবের ইবনে হায়ান, তৎপরবর্তীতে নিউটন, তৎপরবর্তীতে যথাক্রমে জে.জে. থমসন, রাদারফোর্ড আইনস্টাইন, ম্যাক্স প্ল্যাঙক, হাইজেনবার্গ, নীল বোরসহ আরও অনেক জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী যাঁরা অনু থেকে পরমাণু, পরমাণু থেকে অতিপারমাণবিকতায় পৌঁছে নিউটনীয় ক্ল্যাসিকাল বল বিজ্ঞান ছাড়িয়ে কোয়ান্টাম বল বিজ্ঞানে পৌঁছে মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড থিওরির মাধ্যমে একে বারে সত্যের দ্বার প্রান্তে এসে পৌঁছেছে যে দ্বারপ্রান্তে মুসলমানরা সূরাহ আম্বিয়ার ৩০ নং আয়াতের মাধ্যমে দেড় হাজার বছর পর্বে পৌঁছেছিলেন (সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আজীম)।

মুসলিম দুনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণার হালচাল!

অধ্যাপক নিদাল গুয়েসুম ও ড. আতহার ওসামা নামক দুইজন মুসলিম বিজ্ঞান গবেষকের যৌথ গবেষণার বিষয় ছিল মুসলিম দুনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী ধরণের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে, বৈজ্ঞানিক জগতে অবদান কতটুকু তা গবেষণার ভিত্তিতে নিরূপন করে বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তুলনামূলক পরিসংখ্যান তৈরি করে সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা চিহ্নিত করা। এ লক্ষ্যে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র তৈরি করা হয়েছে যা পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এ গত বছরের ৪ জুলাইতে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে এই দুঃখবোধ নিয়ে যে, বিশ্বের ১৬০ কোটি মুসলমান, যাঁরা ৫৭টা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারে তাঁদের অবদান খুবই নগন্য। নোবেল পুরস্কারের শতাধিক বছরের ইতিহাসে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র গুটি কয়েক মুসলমান বিজ্ঞানী। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও ওআইসির সদস্যদেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও যৎসামান্য। ২০১৪-২০১৫ বছরের কিউ.এস. ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির র ্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মুসলিম বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।

শীর্ষ ৪০০টির মধ্যে আছে মাত্র ১৭টি; ৩০০টির মধ্যে আছে মাত্র ১১টি। মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণতঃ গবেষণা হয় খুবই কম, গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দ করা হয় কম, দক্ষ শিক্ষকের অভাব প্রকট এবং বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ানোর ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কল্পনা, সৃজনশীলতা ও বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি হয় না বল্লেই চলে।

কারণ, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নত ও উচ্চতর বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপযোগী প্রতিষ্ঠান নেই, অর্থ নেই, উদ্যোগ নেই, আগ্রহও তেমন নেই। আমেরিকায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি; বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারবিজয়ী দেশগুলোর তালিকায় আমেরিকা সবার শীর্ষে। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৩৬ জন আমেরিকান বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েরই ৮০ জন শিক্ষক বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আমেরিকায় বিজ্ঞান গবেষণার সুযোগ এত বেশি যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও বিজ্ঞানী-গবেষক আমেরিকায় চলে যান।

অধ্যাপক নিদাল গুয়েসুম ও ড. আতহার ওসামার গবেষণায় গোটা মুসলিম দুনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে বহির্বিশ্বের অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা তুলনামূলক চিত্র-বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়। তাতে অভিন্ন যে বিষয়টি লক্ষ্য করা হয়েছে তা হচ্ছে গণিতাংকের পাশাপাশি বিজ্ঞানাতাংক।

বিজ্ঞানাতংকঃ দেশে দেশে

উল্লেখ্য, উইলিয়াম জিনসার নামের এক মার্কিন অধ্যাপক তাঁর রাইটিং টু লার্ন গ্রন্থের ভূমিকার এক জায়গায় লিখেছেন, আমেরিকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেসব শিক্ষার্থী মানবিক বিভাগের বিভিন্ন বিষয়ে পড়েন, তাঁরা বিজ্ঞান ও গণিতের নাম শুনলে ভয়ে আঁতকে ওঠেন। একইভাবে বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষার্থীরা আঁতকে ওঠেন মানবিক বিদ্যাগুলোর নাম শুনলে। সংগত কারণে কার্ল সাগানের স্ত্রী, মার্কিন বিজ্ঞান সংস্থার নির্বাচিত সেক্রেটারী, বিশিষ্ট বিজ্ঞান বিষয়ক লেখিকা মিসেস অ্যান ড্রুয়ান প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, আমি অনেক মেধাবী ছেলেকে চিনি যারা বিজ্ঞানকে ঘৃণা করে থাকে। তবে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ব্যাপার। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে উন্নত অমুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পার্থক্য হলো, ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর পাঠ্যসূচিতে মানবিক বিদ্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিশেষত, প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষাক্ষেত্রে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি ও হোলিস্টিক পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হয়। মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থাকে একতরফা সিলেবাস। ফলে বিজ্ঞানের ছাত্র মানবিক বিজ্ঞানের নাগাল পান না, মানবিকের ছাত্র বিজ্ঞানের নাগাল পান না। ফলে বিজ্ঞানের ছাত্রদের মধ্যে মানবিক জ্ঞানের অপ্রতুলতা যেমন থেকে যায় তেমনি মানবিক বিজ্ঞানের ছাত্রদের মধ্যে অপ্রতুলতা থাকে বিজ্ঞান প্রবণতা।  

মুসলিম বিজ্ঞান গবেষক নিদাল গুয়েসুম: নিরাশার মাঝে আশার আলো!

আধুনিক মুসলিম বিজ্ঞান গবেষক নিদাল গুয়েসুমের জীবন কাহিনীঃ

নিদাল গুয়েসুমের জন্ম মরক্কোতে, আলজিয়ার্সের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চতর শিক্ষার জন্য চলে যান আমেরিকায়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, স্যান ডিয়েগো থেকে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন নাসায়। আরব দুনিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ মেধাবী শিক্ষার্থী, বিশেষত তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের প্রতি যাঁদের আগ্রহ, তাঁরা শিক্ষকতা ও গবেষণার সুযোগ পেলে ইউরোপ-আমেরিকায় থেকে যান।

কিন্তু মাগরেবের (উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলীয় আফ্রিকা) দরিদ্র আরব দেশ মরক্কোর সন্তান নিদাল গুয়েসুম সেই আমেরিকায় উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পেয়েও বেশি দিন থাকেননি। পিএইচডির পর পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে নাসায় দুই বছর কাজ করেই ফিরে যান স্বদেশে। শিক্ষকতা শুরু করেন ইউনিভার্সিটি অব ব্লিদায়। তারপর পাঁচ বছর শিক্ষকতা করেন কুয়েতের কলেজ অব টেকনোলজি স্টাডিজে। ২০০০ সাল থেকে অধ্যাপনা করছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব শারজার পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগে। ৫৬ বছর বয়সী এই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীর মূল আগ্রহের বিষয় গামা-রে অ্যাস্ট্রোফিজিকস; ছায়াপথে পজিট্রন-ইলেকট্রন বিনাশপ্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বেশ কিছু সন্দর্ভ রচনা করেছেন, সেগুলো উচ্চ মর্যাদা পেয়েছে।

কিন্তু এই ভদ্রলোকের একমাত্র আগ্রহের বিষয় বিজ্ঞান নয়। তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রে আছে মানুষ, সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম বিশ্বের মানুষ, তার শিক্ষা ও সামগ্রিক অগ্রগতি। তাই তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্র সীমিত রেখেছেন জন্মভূমি আলজেরিয়া আর আরব দুনিয়ার মধ্যেই। তিনি মুসলিম সংস্কৃতিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তন চান। ২০১০ সালে তিনি প্রকাশ করেছেন ইসলামস কোয়ান্টাম কোয়েশ্চন: রিকনসাইলিং মুসলিম ট্র্যাডিশন অ্যান্ড মডার্ন সায়েন্স নামে একটি গ্রন্থ, যেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেছপ্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।

বস্তুতঃ মুসলমানরা যেদিন থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ছেড়ে দিয়েছিলেন সেদিন, সে ক্ষণ থেকে জিল্লতির সূচনা ঘটিয়েছিলেন যা বর্তমান স্মরণকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অথচ পবিত্র ক্বুরআনের প্রথম সূরাহ আল আলাক্বের প্রথম আয়াতের সর্বপ্রথম শব্দ ইকরাপড়ো (To Read) "জ্ঞানের প্রসঙ্গ লইয়া হজরতের পয়গাম্বরী জীবন শুরুঃ (গোলাম মোস্তফাঃ বিশ্বনবী দ্রঃ)।

 উল্লেখ্য, বাহারুল উলুম হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে হজরত আলীকে প্রথম মুসলমান বৈজ্ঞানিক বলেও মানা হয়। কারণ সাধারণ মানুষকে তিনি বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত বহু মজাদার ঘটনা শোনাতেন (https://www.ndtv.com/bengali/who-was-hazrat-ali-1903125)। পারদ এর কেমিক্যালাইজেশনের পন্থা বাতলিয়ে হযরত অআলী রাঃ পদার্থ বিজ্ঞানের ভিত রচনা করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী আহলে (আলে) বাইতি রসূল হযরত জাফর সাদেক রহিমাহুল্লাহ তদীয় ছাত্র জাবির ইবনে হাইয়ান.আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা-কে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। যার ফলশ্রুতিতে মধ্যযুগে মুসলিম রাজ দরবারে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের দারুন আছর বা প্রভাব পড়েছিল। এতে রাজকীয়ভাবে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন উমাইয়া খেলাফতের উত্তরসূরী খালিদ ইবনে ইয়াজিদ আল আরাবি। খালিদ সিংহাসনের দাবী ছেড়ে হিকমাত অর্থ জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-কে বেছে নিয়ে নিরলসভাবে রসায়ন বিজ্ঞান সাধনায় আত্মনিয়োগ করে পরশ পাথর প্রযুক্তি রপ্ত করেছিলেন। খালিদ অআল অআরাবী মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম ইসলামিক সায়েন্স ল্যাবরেটরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ ধারাবাহিকতায় খলিফাতুল মুসলিমিন হারুন-উর-রশিদের মাধ্যমে বাগদাদে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতীক "বায়তুল হিকমাহ" (বাগদাদ), মুসলিম শাসিত স্পেনের গ্রানাডার কর্ডোভায় অবস্থিত "আলহামরা", কায়রোর "আল আযহার" যার আধুনিক রূপ আজকের অক্সফোর্ড আর কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি।

আলহামদুলিল্লাহ। কোয়ান্টাম তাত্ত্বিক এবং কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেলভিত্তিক ডিজিটাল পদ্ধতির বিশেষ করে  পদার্থ বিজ্ঞান তথা বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্ব আজ পরম সত্যের তথা ইসলামের প্রায় দ্বারপ্রান্তে উপনীত।

উল্লেখ্য, যুগে যুগে মানব জাতি রোম সভ্যতার নামে, গ্রীক সভ্যতার নামে কিংবা মিশরীয় মেসোপডিয়ান সভ্যতার নামে কিংবা মধ্যযুগে আব্বাসীয়, ফাতেমী কিংবা স্পেনের আলহামরায় ইসলামী সভ্যতার নামে বিজ্ঞান চর্চা হয়েছিল।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, এ প্রজন্মের মুসলমান ভুলেই গেছেন যে, তাঁরা বিজ্ঞানী জাতি। ভুলে যাওয়ার কারণে আজ মুসলিম সমাজে নেমে এসেছে চতুর্মুখী নানান অপবাদ, কুটুক্তি, নির্যাতন। এমনকি মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানের উর্বরতাকে অস্বীকার করে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় অজ্ঞতাকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, মুসলমানদের মধ্যে প্রাণ নেই, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনুভূতি টুকুন নেই!

কেন অতি নির্মম কায়দায় মুসলিম হত্যা? এ প্রশ্নের নির্ভিক জবাব আসে জীব হত্যা মহাপাপ নীতির অনুসারী নির্যাতকদের পক্ষ হতে এই বলেঃ "মুসলমানরা প্রাণী নয়" অর্থাৎ জড়।বহুজাতিক এক সূত্রে বলা হয়ঃ মুসলমানদের উপর গুলি চালানো হলে নাকি তারা পাখি শিকারের সুখ পান! যা সত্যিই দুঃখজনক। মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদস্বরূপ ন্যুনতম নিন্দাসূচক কেবল "শেম" (Shame) শব্দ জাতিসংঘে পাওয়ার অধিকার থেকেও আমরা বন্চিত, অধিকারহারা।

এ ধরণের নেতিবাচক মিথ বা বদ্ধমূল ধারণা আন্তঃধর্মীয় শান্তিপূর্ণ বৈশ্বিক সহাবস্থান নীতির বরখেলাপ।

অবশ্য এ ধরণের মিথ বা বদ্ধমূল ধারণার জন্য আমরা মুসলমানদের দায়বদ্ধতা কম নয়। কারণ, যে সব কারণে মুসলিম নির্যাতন হচ্ছে তন্মধ্যে অন্যতম একটি কারণ, বর্তমানে মুসলমানরা মধ্যযুগের ন্যায় বিজ্ঞান চর্চা এবং বিজ্ঞানে নেতৃত্ব থেকে সরে আসায় "মুসলমানরা অবৈজ্ঞানিক জাতি"-এই মিথ বা বদ্ধমূল ধারণা অমুসলিম বিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সহায়ক হয়েছে। যা অপবাদকারীরা যুগ যুগ ধরে তাদের উত্তরসূরী থেকে ক্রমাগত এ ধারণাই পেয়ে আসছে।এ ক্ষেত্রে আমাদের দায়বদ্ধতা হচ্ছে, আমরা এবং আমাদের পূর্বসূরীরা আমাদের প্রজন্মকে আমাদের বৈজ্ঞানিক সোনালী ইতিহাসের গল্প  না শুনিয়ে রূপকথার গল্প কাহিনী শুনিয়েছি, শোনাচ্ছি হয়তো বা শোনাবো।

আমরা শোনাচ্ছি না মধ্যযুগের বাগদাদের বায়তুল হিকমাহয় বিশ্বের জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের অপূর্ব সমাহারের কাহিনী কিংবা মধ্যযুগে প্রায় ৮০০ বছর যাবৎ মুসলিম শাসিত ইউরোপীয় দেশ স্পেনের কর্ডোবার আলহামরায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞান চর্চা, ১০০১ (একহাজার একটি) যুগান্তকরি আবিস্কারসমূহের কাহিনী।

ফলশ্রুতিতে এ প্রজন্মের জানা থাকার কথা নয় যে, আমরা বিজ্ঞান জাতি। আমাদের রয়েছে অতীত সোনালী বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বের গল্প, কাহিনী, ইতিহাস। এসব না জানার কারণে বর্তমান প্রজন্মরা আজ দারুন হীনমন্যতায় হতাশ। কারণ, চতুর্মুখী অপবাদের জবাবের ভাষা যে তাদের জানা নেই !

আধুনিক বিজ্ঞানে মুসলমানদের ভূমিকা

 গত বিংশ শতাব্দীর শেষপাদে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন। তাতে অংশ গ্রহণকারী ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা প্রসঙ্গক্রমে আবেগ-উচ্ছাসিতভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, ইউরোপীয়ান বিজ্ঞানীদের শিক্ষক ছিলেন আরব মুসলিম বিজ্ঞানীরা। তাঁদের পূর্বপুরুষরা দলে দলে মুসলিম বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্রে (বায়তুল হিকমাহ, আলহামরা, আল আযহার) ছাত্র হিসাবে অধ্যয়নরত ছিলেন (তথ্য সূত্রঃ দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ)।

 এরও আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন আওয়ার ২৮ জুন ১৯৫৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসলামিক সেন্টারের মসজিদ উদ্বোধন কালে একই আবেগে মন্তব্য করেছিলেনঃ আমরা সভ্যতার যা কিছু পেয়েছি মুসলমান হতে, আর মুসলমান পেয়েছেন আল কুরআন থেকে (সূত্রঃ মাসিক নেদায়ে ইসলাম)।এ হলো মধ্যযুগীয় মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের বৈজ্ঞানিক সোনালী যুগের উর্বরতার কিসসা-কাহিনী। 

তবে, সুখের বিষয়, মুসলিম উম্মাহর উপরোক্ত বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের মধ্যে মধ্যযুগীয় ইসলামী বিজ্ঞান চর্চা, বিজ্ঞানে নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে কাজাখিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবনায় ওআইসির বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক অঙ্গ সংস্থার উদ্যোগে প্রথমবারের মত বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ১০ এবং ১১ সেপ্টেম্বর সম্মেলন কাজাখ রাজধানী আস্তানায়। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানরা মুসলমানদের প্রতি আবারও বিজ্ঞান চর্চা পুনরুজ্জীবনের জন্য উদাত্ত্ব আহবান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে আস্তানা ডিক্লারেশন ২০১৭ জারি করা হয়(https://www.oic-oci.org/docdown/?docID=1604&refID=1067)।

উক্ত ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ২০১৮ সালের ১৪ আগষ্ট মুসলমানদের মধ্যে পুনরায় বিজ্ঞান চর্চা এবং নেতৃত্বে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে গঠন করা হয় বেসরকারী উদ্যোগে Islamic Research for Reviving of Science-Tech Center [(IRRSTC) https://irrstc1439.blogspot.com]

i)                   The Center of Islamic Research for Nuclear-Neuron [(CIRNN) https://cirnn1445.blogspot.com)

ii)                 ইষ্টার্ণ সায়েন্স-টেক রিভিউ (বাংলাদেশ): Eastern Science-Tech Review(Bangladesh)[https://estr1442.blogspot.com]

 i)                   ইসলামিক সায়েন্স-টেক ইনফরমেশন ব্যাংক: Islamic Science-Tech Information Bank(ISTIB

গবেষণামূলক গ্রন্থঃ

১) স্ট্রিং থিওরিঃ বিজ্ঞানীদের আশার আলো ()https://www.google.com/search?client=firefox-b-d&q=ট্রিং+থিওরিঃ+বিজ্ঞানীদের+আশার+আলো)

 ২) মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়! (https://www.linkedin.com/pulse/মহকরষ-মহবশবর-মহবসময়-muhammad-sheikh-ramzan-hossain/?trk=pulse-article_more-articles_related-content-card

৪) বিজ্ঞানে জানার আছে অনেক কিছু

(https://www.linkedin.com/pulse/বিজ্ঞানে জানার আছে অনেক কিছু)


Comments

Popular posts from this blog

Galaxy AzTECC71 as imaged by the James Webb Space Telescope.

আমরা মুসলমানদেরকে আবারও কেন ফিরে যেতে হবে বিজ্ঞানে? (দ্বিতীয় খন্ড)